শীতলক্ষা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এদেশের অন্যতম প্রাচীন শিল্প ও ঐতিহাসিক বাণিজ্যনগরী নারায়ণগঞ্জ সবসময়ই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। এখানকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার নাগরিক সুবিধাও এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ আর সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে এই মেগাসিটির বাসিন্দাদের দুটি প্রধান সমস্যা—নিরাপদ পানির সংকট এবং তীব্র জলাবদ্ধতা—আজ চরমে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি জনদুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে নারায়ণগঞ্জকে একটি আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে এবার এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
প্রায় ১ হাজার ৬৯৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এনজিআরইউডিপি)’ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০৩১ সালের মার্চের মধ্যে ৫ বছর মেয়াদি এই মেগা প্রকল্প যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক), যার সিংহভাগ অর্থায়ন নিশ্চিত করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
পটভূমি ও বাস্তবায়নের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: প্রকল্পটির প্রশাসনিক যাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একনেক সভায় এই মেগা প্রকল্পটি নীতিগত অনুমোদন পায়। তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আকর্ষণীয় নামের চেয়ে কাজের বাস্তব রূপায়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকার (বিএনপি সরকার) দায়িত্ব নেওয়ার পর, এই মেগা প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এখন নতুন নির্বাচিত সরকারের অধীনেই শুরু হচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে প্রকল্পটির স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ শেষ করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
২৪ ঘণ্টা সুপেয় পানি সরবরাহ ও সিস্টেম লস কমানোর লক্ষ্য: এই মেগা প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ড্যান্ডি অব দ্য ইস্ট খ্যাত এই শহরের প্রতিটি বাসাবাড়িতে সারাবছর ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। নতুন ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপন এবং বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যাপক সম্প্রসারণের পাশাপাশি গোদনাইল পানি শোধনাগার এবং প্রোডাকশন টিউবওয়েলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা হবে।
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে উৎপাদিত পানির প্রায় ৬৫ শতাংশই বিভিন্ন ত্রুটি ও অবৈধ সংযোগের কারণে অপচয় (নন-রেভিনিউ ওয়াটার) হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই অপচয় মাত্র ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মেঘনা ও শীতলক্ষা নদীর পানি শোধন করে উন্নত পাইপলাইনের মাধ্যমে বৈষম্যহীনভাবে শহরজুড়ে সমান চাপে পানি বিতরণ করা হবে। এছাড়া জনবহুল এলাকায় সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ পানি সহজলভ্য করতে বিশেষ 'ওয়াটার এটিএম' শেড নির্মাণ করা হবে।
খাল পুনরুদ্ধার ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থায় জলাবদ্ধতা মুক্তি: নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও কদমরসুল—এই তিন অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য বর্ষাকাল মানেই এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। সামান্য বৃষ্টিতেও রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়া এবং পানিবাহিত রোগের বিস্তার এখন স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে প্রকল্পে নতুন ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুরোনো জরাজীর্ণ ড্রেনগুলোর আমূল সংস্কার ও পুনর্বাসন করা হবে। একই সাথে শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন খালগুলো অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার জোরালো প্রস্তাব রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমকে গতিশীল করতে নাসিকের জন্য উচ্চচাপের জেটার, ডাম্প ট্রাক ও পাওয়ার রডারের মতো অত্যাধুনিক ড্রেন পরিষ্কারের যন্ত্রপাতি কেনা হবে।
সবুজায়ন, বিনোদন কেন্দ্র ও আগামী কয়েক দশকের মাস্টারপ্ল্যান: ব্যস্ত এই শিল্পনগরীতে জনসাধারণের একটু মুক্ত বাতাস নেওয়া, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা এবং সামাজিক সংহতি প্রকাশের জন্য উন্মুক্ত স্থানের তীব্র সংকট রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এই প্রকল্পে বেশ কয়েকটি আধুনিক পার্ক (পার্ক এ এবং বি), খেলার মাঠ, উন্মুক্ত কমিউনিটি স্পেস ও কমুনিটি সেন্টার নির্মাণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্রুত শিল্পায়ন ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলাতে এই প্রকল্পের আওতায় আগামী কয়েক দশকের উপযোগী করে নগর পরিকল্পনা, পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি জলবায়ু-সহনশীল দীর্ঘমেয়াদি 'মাস্টারপ্ল্যান' প্রণয়ন করা হবে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য টেকসই নগরীর শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।
সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ ও নাগরিক অধিকার: নিঃসন্দেহে এটি নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম এবং দূরদর্শী একটি অফিশিয়াল উদ্যোগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কারমুখী পরিকল্পনার পর এখন নির্বাচিত নতুন রাজনৈতিক সরকারের অধীনে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হচ্ছে। ব্যবস্থার পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক দলের অদল-বদল হতে পারে, কিন্তু একটি সত্য চিরন্তন—এই প্রকল্পের জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণ বা সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তার মূল জোগান আসে এই শহরের আপামর ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তা এবং সাধারণ হোল্ডিং মালিকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টের ট্যাক্সের টাকায়।
সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মকর্তা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কিংবা ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতাকর্মী এই বিপুল ফান্ডের মালিক নন; তারা কেবল জনগণের এই আমানতের পবিত্র ট্রাস্টি বা সাময়িক রক্ষক মাত্র। নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিকেরা আজ নিজেদের অধিকার, ট্যাক্সের টাকা এবং প্রতিটা নাগরিক সুবিধার হিসাব রাখতে সম্পূর্ণ সচেতন ও সোচ্চার।
অতএব, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই ১ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টে যাতে কোনো ধরনের টেন্ডারবাজি, স্বজনপ্রীতি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার কিংবা ধীরগতির নামে জনগণের অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি না হয়, সে ব্যাপারে নাসিক কর্তৃপক্ষ, প্রকল্প পরিচালক এবং বর্তমান সরকারকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানাই। দল বা ব্যবস্থার পরিবর্তনের চেয়ে কাজের বাস্তব ও সৎ রূপায়নই আসল। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় এই প্রকল্প যেন কোনো রাজনৈতিক চাটুকারিতার শিকার না হয়ে সততা ও শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে মাটিতে বাস্তবায়িত হয়—সেটিই আজ সচেতন নগরবাসীর একমাত্র জোরালো দাবি।
লিখেছেন: তারাক আজিজ, সম্পাদক, bdnewsnet.com.bd
0 Comments