ঐতিহাসিক শীতলক্ষ্যা নদীর মনোরম তীরে এক ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধিরগঞ্জ পূর্ব থানার উদ্যোগে ‘সম্মিলিত ঈদ আড্ডা’। গত ৩১ মে ২০২৬, বিকেল বেলা নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বশীল ও রোকনদের নিয়ে এই ঈদ আড্ডার আয়োজন করা হয়। আসরের নামাজের পর থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র সংগঠনের আমন্ত্রিত রোকন ও সুনির্দিষ্ট দায়িত্বশীলেরা অংশ নেন। নদীপাড়ের মুক্ত বাতাসে দীর্ঘদিন পর এমন উন্মুক্ত আয়োজনে নেতাকর্মীদের মাঝে এক অভূতপূর্ব আনন্দ ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জ পূর্ব থানার আমীর আলী আক্কাস রুম্মনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ মহানগরীর সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন। থানা সেক্রেটারি শহিদুল্লাহ শহীদের চমৎকার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আসন্ন নাসিক নির্বাচনে ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী তারেক আজিজ, ৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মাওলানা হাবিবুল্লাহ বাহার এবং ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী প্রিন্সিপাল আব্দুল গফুর মোল্লা। এছাড়াও থানার কর্মপরিষদের অন্যতম সদস্য মো. শাকিলসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আড্ডায় অংশ নেন।
১৬ বছরের জুলুমের স্মৃতি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহানগর সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন বিগত ১৬ বছরে জামায়াতে ইসলামীর ওপর দিয়ে যাওয়া পৈশাচিক নির্যাতন, দমন-পীড়ন এবং স্বৈরাচারী শাসনের দুঃসহ স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "বিগত দেড় দশকে এমন পাবলিক স্পেসে, বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জের এই নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা মুক্ত বাতাসে কোনো উৎসব বা ঈদের অনুষ্ঠান করব—তা সম্পূর্ণ অসম্ভব ও কল্পনাতীত ছিল।" তিনি এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে গভীর শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন এবং উপস্থিত সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
শৈশবের শীতলক্ষ্যা ও বিপ্লবী আন্দোলনের প্রার্থী
৪নং ওয়ার্ডের জামায়াত মনোনীত কমিশনার পদপ্রার্থী তারেক আজিজ তাঁর বক্তব্যে শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, "এই শীতলক্ষ্যার তীরেই আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। আজ সেই চেনা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েই একটি বিপ্লবী এবং আপসহীন ইসলামী আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছি, এটা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের ও কৃতজ্ঞতার।" ৪নং ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
১৭ বছরের ত্যাগ ও তিতিক্ষার গল্প: মাওলানা হাবিবুল্লাহ বাহার
৫নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মাওলানা হাবিবুল্লাহ বাহার তাঁর দীর্ঘ ও ত্যাগী রাজনৈতিক জীবনের কথা তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করেন কীভাবে বিগত ১৭ বছর শত কষ্টের মাঝেও, ফেরারি জীবন যাপন করেও তিনি ইসলামী আন্দোলনের হাত ছেড়ে দেননি। অনেক ঈদ যে পরিবার পরিজন ছেড়ে অত্যন্ত কষ্টে ও গোপনে কাটাতে হয়েছে, সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, এলাকার জনগণের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং আন্দোলনের প্রতি অবিচল আস্থাই আজ তাঁকে এই অবস্থানে এনেছে।
আদমজীর শ্রমিক আন্দোলন ও শিক্ষকতার ইতিহাস: আব্দুল গফুর মোল্লা
৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী প্রিন্সিপাল আব্দুল গফুর মোল্লা আদমজী ইপিজেড ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর দীর্ঘদিনের সুনামের কথা উল্লেখ করেন। একই সাথে ওই অঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলন এবং জামায়াতে ইসলামীর সাথে সাধারণ মেহনতি মানুষের সম্পৃক্ততার ঐতিহাসিক সম্ভাবনা ও আগামী নির্বাচনে বিজয়ের রোডম্যাপ তুলে ধরেন তিনি।
সভাপতির আবেগঘন বক্তব্য ও সমাপনী
সমাপনী বক্তব্যে সিদ্ধিরগঞ্জ পূর্ব থানার আমীর আলী আক্কাস রুম্মন আড্ডায় উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। শীতলক্ষ্যার তীরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে নিজের শৈশব, রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রাম এবং সংগঠনের প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি স্মরণ করেন, কীভাবে তিলে তিলে শত বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ সিদ্ধিরগঞ্জের মাটিতে জামায়াতে ইসলামীকে একটি সম্মানিত ও গর্বিত অবস্থানে নিয়ে গেছেন।
নদীর পাড়ে বসে চা-আড্ডার ছলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি কেবল একটি ঈদ আড্ডাই ছিল না, বরং আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে সিদ্ধিরগঞ্জের ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে জামায়াতের ভেতরের সাংগঠনিক শক্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও সুসংহত করার এক অনন্য মেলবন্ধনে পরিণত হয়।